ঈদকে সামনে রেখে করোনাভাইরাসের সুযোগ নিয়ে পোশাক খাতের ভাবমূর্তি নষ্ট ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে তৎপর রয়েছে একটি চক্র। এর জন্য কিছু অরাজনৈতিক সংগঠনের শ্রমিক নেতা শ্রমিকদের মদদ ও উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়া সংগঠনগুলো তাদের নেতাকর্মী-সমর্থকদের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় পাঠিয়ে বেতনবৈষম্য নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারেন। গত সপ্তাহে তৈরি করা সরকারের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে ১০ শ্রমিক নেতার নাম এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, আগামী ২৪ মে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হলে ২০ থেকে ২২ মে'র মধ্যে মাস পূর্ণ না হওয়ায় শ্রমিকদের শুধুমাত্র ঈদ বোনাস দেওয়া হবে। এতে শ্রমিক নেতারা তাদের ভুল বুঝিয়ে মে মাসের বেতন বোনাস একত্রে দেওয়ার জন্য শ্রমিকদের আন্দোলনে নামিয়ে গার্মেন্ট সেক্টরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালাতে পারেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন ১০ শ্রমিক নেতার কর্মকান্ড সন্দেহজনক বলে উলেস্নখ করা হয়েছে। ওই নেতারা হলেন- গার্মেন্ট ওয়াকার্স ফেডারেশনের নেতা মিজানুর রহমান; গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি আমিনুল ইসলাম; গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ; গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার; গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি কাজী রুহুল আমিন; সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার; গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মোশরেফা মিশু; স্বাধীন বাংলা গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি আল কামরান; বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়াকার্স ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আক্তার ও বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি আলী রেজা চৌধুরী তুহিন প্রমুখ। প্রতিবেদনে এ ১০ শ্রমিক নেতাকে নজরদারিতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং জীবিকার পথ যাতে রুদ্ধ না হয় সে লক্ষ্যে সরকার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে এলাকাভিত্তিক সীমিত আকারে স্বল্প লোক দিয়ে গার্মেন্ট কারখানা চালুর উদ্যোগ নেয়। এজন্য ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার গাজীপুর এলাকায় ৫২৭টি শিল্পকারখানা খুলেছে। এছাড়া আশুলিয়ায় ছোট বড় ৬৩০ কারখানার মধ্যে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫৮টি, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলে মোট ২ হাজার ৪৫৯ কারখানার মধ্যে ৩০১টি এবং চট্টগ্রামে ১২২৯টি কারখানা ও মধ্যে ৬০৫টি কারখানা খোলা হয়েছে। এসব কারখানায় শ্রমিক উপস্থিতির হদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ কারখানায় শ্রমিকদের বেতনভাতা পরিশোধ করা।
২৮ এপিল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গি-গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে মোট ৭ হাজার ৬০২টি গার্মেন্টের মধ্যে ৭ হাজার ২৪টি গার্মেন্ট শ্রমিকদের বকেয়া বেতনভাতা পরিশোধ করা হয়েছে।
তবে কিছু গার্মেন্ট মালিক বেতনভাতা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর ও কারখানার সামনে অবস্থান নেওয়ার মতো কর্মকান্ড ঘটছে। এমতাবস্থায় তাদের বেতনভাতা পরিশোধ না করলে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়েছে।
এদিকে, গত সোমবার পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নিয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের সভাপতিত্বে শ্রম ভবনে একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের শতভাগ মজুরি দাবি করেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি)। বৈঠকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, করোনার কারণে এপ্রিলে কারখানা বন্ধের সময়ে শ্রমিকেরা ৬৫ শতাংশ মজুরি পাবেন। তবে বাড়তি ৫ শতাংশ অর্থ চলতি মে মাসের মজুরির সঙ্গে দেবে মালিকেরা। তার আগে ত্রিপক্ষীয় সভায় ৬০ শতাংশ মজুরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। যদিও আইবিসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জানা গেছে, সভায় আইবিসির নেতারা গত এপ্রিলের শতভাগ মজুরি পরিশোধের দাবি করেন। তবে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতারা মজুরি বৃদ্ধির কোনো প্রস্তাব আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানান। একইভাবে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ফজলুল হক মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনার সুযোগ নেই জানালে সভায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পরে দীর্ঘসময় আলোচনার পর মালিকপক্ষের দুজন ৬৫ শতাংশ মজুরি পরিশোধ করার কথা জানান। তখন আইবিসির নেতারা সেটি বিরোধিতা করে একে একে সভা ত্যাগ করেন।
শ্রমিক ছাঁটাই চলছে : গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশে লকডাউন চলাকালীন গার্মেন্টশ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ না করে কিছু মালিক উল্টো শ্রমিক ছাঁটাই করছেন, যা অনভিপ্রেত। উদাহরণস্বরূপ আশুলিয়ার ইউসুফ মার্কেটে অবস্থিত একটি কারখানা সিগমা ফ্যাশন লিমিটেডের মোট শ্রমিক সংখ্যা ১৪০০ জন। ২৫ এপ্রিল ওই কারখানার ৭০৯ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। যার কারণে তারা কারখানার গেটের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। যদিও বিজিএমইএ, বিকেএমই প্রকাশ্যে বলেছে, তারা করোনা পরিস্থিতির মধ্যে কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করবেন না। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিক ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে গার্মেন্ট সেক্টরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিকদের কারখানাগুলোতে কাজ করার কথা। বেশ কিছু গার্মেন্ট তাদের মেশিনারিজ এক ধাপ সরিয়ে সামাজিক দূরত্বেও পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তবে কিছু কিছু কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। এরূপ কার্মকান্ড ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া শ্রমিকদের আবাসস্থল এবং চলাচলের পথে কারখানার মালিকদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। ফলে শ্রমিকরা নিজের ইচ্ছেমতো চলাচল ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের কারণে তাদের কারণে অন্যদের করোনায় সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়েছে, যেসব কারখানা চালু করা হয়েছে মালিকরা তাদের চাহিদা ও অর্ডার অনুযায়ী, সীমিত পরিসরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে কারখানা চালাবে। এ ক্ষেত্রে কারখানাগুলোতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শ্রমিক কাজ করার সুযোগ পাবেন। কাজ করা শ্রমিকরা পুরো মাসের বেতনভাতা পাবেন। অন্যদিকে, কাজ করার সুযোগ না পাওয়া শ্রমিকদের মূল বেতনের ৬০ শতাংশ দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সব শ্রমিকই কাজে যোগ দিয়ে পুরো মাসের বেতনভাতা পেতে চাইবেন। এতে কাজে সুযোগ না পাওয়া শ্রমিকরা শ্রমিক নেতাদের উসকানিতে পুরো বেতনের দাবিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যায়যায়দিনকে বলেন, ত্রিপক্ষীয় সভায় এপ্রিল মাসের মজুরি ৬০ শতাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তারপরও সমঝোতার স্বার্থে চলতি মে মাসের সঙ্গে ৫ শতাংশ বাড়তি মজুরি দেওয়ার বিষয়ে তারা একমত হন। তিনি মনে করেন, আইবিসির সব নেতাই শ্রমিক ও শিল্পের স্বার্থে বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। তবে কেউ যদি সিদ্ধান্ত না মানেন তাহলে ধরে নেবেন তারা পোশাক খাতকে বিপদে ফেলে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে কাজ করছেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন বিষয়ে এ উদ্যোক্তা বলেন, বিষয়টি খুব স্পষ্ট যে, কেউ না কেউ শ্রমিকদের ইন্ধন না দিলে পোশাক খাতে শ্রম অসন্তোষ ঘটবে না। এ পরিস্থিতিতে ভারত তার দেশে টেক্সটাইল খাতে শ্রমিকদের মজুরি দেবে ৬০ শতাংশ। তারা কম দিলেন কোথায়। তিনি মনে করেন এ খাতকে অস্থির করা এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিছু শ্রমিক নেতা অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। তারা অতীতেও এ ধরনের শ্রম অসন্তোষ ঘটিয়েছেন। দেশের এ পরিস্থিতির মধ্যেও যদি কেউ শ্রমিকদের মদদ ও উসকানি দিয়ে অস্থিতিশীল সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন তাহলে কঠোর হাতে তাদের দমনের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে- কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি পালনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কারখানার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের আনা-নেওয়া করা। যেসব কারখানা মালিকের সামর্থ্য আছে শ্রমিকদের নিজস্ব আবাসনের জন্য ডরমেটরির ব্যবস্থা করা। শ্রমিকদের উপস্থিতি যেন কোনো ভাবেই ৫০ শতাংশের বেশি না হয় তা নিশ্চিত করা। যেসব শ্রমিক গ্রামের বাড়িতে আছেন তারা যাতে কারখানায় আসার সুযোগ না পান সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সন্দেহভাজন শ্রমিক নেতাদের নজরদারিতে রাখা।


0 Comments